খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeবিশ্ব সংবাদইন্ডিয়া নিউজতৃণমূলে বড় ভাঙন! মমতা নাকি বিদ্রোহীরা—কার হাতে যাবে দলের আসল অধিকার?

তৃণমূলে বড় ভাঙন! মমতা নাকি বিদ্রোহীরা—কার হাতে যাবে দলের আসল অধিকার?

একদিকে ঋতব্রত ব্যানার্জীর নেতৃত্বে একটি অংশ বিজেপিবিরোধী অবস্থান বজায় রাখার কথা বলছে। অন্যদিকে সংসদীয় বিদ্রোহী গোষ্ঠীর একটি অংশ বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএকে সমর্থনের ঘোষণা দিয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ সংকট নতুন মাত্রা পেয়েছে। দলীয় নেতৃত্ব, সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ এবং আইনসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রশ্নকে কেন্দ্র করে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, যা অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষককে অতীতের শিবসেনা ও এনসিপি বিভাজনের ঘটনাগুলোর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষের মনে এখন বড় প্রশ্ন—দলীয় প্রতীক ও বিপুল সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ কি শেষ পর্যন্ত মমতা ব্যানার্জী ও অভিষেক ব্যানার্জীর হাতেই থাকবে, নাকি তা অন্য কোনও গোষ্ঠীর হাতে চলে যেতে পারে?

তৃণমূল কংগ্রেসে ভাঙনের বর্তমান চিত্র

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের পর সরকার গঠনের অল্প সময়ের মধ্যেই তৃণমূল কংগ্রেসে ব্যাপক ভাঙনের খবর সামনে আসে। দাবি করা হচ্ছে, দলের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিধায়ক ও সাংসদ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন।

বিধানসভায় বিদ্রোহী শিবিরের নেতৃত্বে রয়েছেন ঋতব্রত ব্যানার্জী। তার পক্ষে বহু বিধায়ক সমর্থন জানিয়েছেন বলে জানা গেছে। অন্যদিকে সংসদীয় দলের একটি অংশ প্রকাশ্যে বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোটের প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেছে। এর ফলে দলটি কার্যত একাধিক গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।

রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে, এই পরিস্থিতি কি শেষ পর্যন্ত তৃণমূল কংগ্রেসের দলীয় প্রতীক ও সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে আইনি লড়াইয়ের দিকে যাবে?

রাজনৈতিক দলের প্রতীক কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

ভারতের নির্বাচনী রাজনীতিতে দলীয় প্রতীক শুধুমাত্র একটি চিহ্ন নয়; এটি একটি রাজনৈতিক দলের পরিচয়, ইতিহাস এবং ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্যতার প্রতীক।

কোনও রাজনৈতিক দল যখন বিভক্ত হয়, তখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়—আসল দল কোনটি? কারণ দলীয় প্রতীক হারানো মানে শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের ক্ষতি নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা সাংগঠনিক শক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কাও তৈরি হয়।

এই কারণেই শিবসেনা, এনসিপি কিংবা কংগ্রেসের অতীত বিভাজনের সময় প্রতীক নিয়ে তীব্র আইনি লড়াই দেখা গিয়েছিল।

আরও পড়ুন :  টানা ৭ দিন বৃষ্টি, ৫০ কিমি বেগে ঝড়! কবে ভিজবে কলকাতা ও দক্ষিণবঙ্গ?

ভারতীয় আইন কী বলে?

ভারতে রাজনৈতিক দলের প্রতীক সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষমতা রয়েছে নির্বাচন কমিশনের হাতে। ‘সিম্বলস অর্ডার, ১৯৬৮’-এর ১৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী, কোনও স্বীকৃত রাজনৈতিক দল ভেঙে গেলে নির্বাচন কমিশন নির্ধারণ করতে পারে কোন গোষ্ঠী প্রকৃত দলের উত্তরাধিকারী।

তবে নির্বাচন কমিশন স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এই প্রক্রিয়া শুরু করে না। দলের কোনও একটি অংশকে আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি জানিয়ে কমিশনের কাছে যেতে হয়।

যদি তৃণমূল কংগ্রেসের কোনও গোষ্ঠী নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ হিসেবে দাবি করে নির্বাচন কমিশনের দ্বারস্থ হয়, তখন কমিশন বিষয়টি খতিয়ে দেখবে।

প্রতীক নির্ধারণে কী কী বিষয় বিবেচনা করা হয়?

দলীয় প্রতীক কার হাতে থাকবে, তা নির্ধারণ করতে নির্বাচন কমিশন সাধারণত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনা করে।

১. সংখ্যাগরিষ্ঠ জনপ্রতিনিধির সমর্থন

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দলের কতজন সাংসদ, বিধায়ক এবং নির্বাচিত প্রতিনিধি কোন গোষ্ঠীর পক্ষে রয়েছেন।

১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক ‘সাদিক আলি বনাম নির্বাচন কমিশন’ মামলার রায়ের ভিত্তিতে এই বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়।

২. সাংগঠনিক সমর্থন

দলের জেলা, ব্লক ও অন্যান্য সাংগঠনিক ইউনিটের অধিকাংশ নেতা ও কর্মী কোন পক্ষের সঙ্গে আছেন, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হয়।

৩. দলীয় সংবিধানের প্রতি আনুগত্য

কোন গোষ্ঠী দলীয় সংবিধান ও নিয়মকানুন বেশি অনুসরণ করছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

৪. দলের আদর্শ ও উদ্দেশ্যের ধারাবাহিকতা

দল প্রতিষ্ঠার সময় যে আদর্শ ও রাজনৈতিক লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, কোন গোষ্ঠী তার সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রেখেছে তা কমিশন বিবেচনা করতে পারে।

তৃণমূলের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কেন জটিল?

তৃণমূল কংগ্রেসের বর্তমান পরিস্থিতিকে অনেকেই শিবসেনা বিভাজনের সঙ্গে তুলনা করলেও বাস্তবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।

আরও পড়ুন :  ট্রেন নাকি হানিমুন স্যুইট? গোলাপ-বেলুনে সাজানো কামরা দেখে চমকে গেল সবাই!

শিবসেনার ক্ষেত্রে মূলত দুটি গোষ্ঠীর মধ্যে বিভাজন হয়েছিল। কিন্তু তৃণমূলের ক্ষেত্রে একাধিক বিদ্রোহী গোষ্ঠীর অস্তিত্বের কথা সামনে এসেছে।

একদিকে ঋতব্রত ব্যানার্জীর নেতৃত্বে একটি অংশ বিজেপিবিরোধী অবস্থান বজায় রাখার কথা বলছে। অন্যদিকে সংসদীয় বিদ্রোহী গোষ্ঠীর একটি অংশ বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএকে সমর্থনের ঘোষণা দিয়েছে।

ফলে প্রশ্ন উঠছে, যদি একাধিক গোষ্ঠী নিজেদের প্রকৃত তৃণমূল হিসেবে দাবি করে, তাহলে নির্বাচন কমিশন কীভাবে সিদ্ধান্ত নেবে?

ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন ত্রিমুখী বিভাজনের নজির খুবই বিরল।

দলীয় সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে কেন আলোচনা?

তৃণমূল কংগ্রেস শুধু রাজনৈতিকভাবে নয়, আর্থিক দিক থেকেও ভারতের অন্যতম শক্তিশালী দল।

সাম্প্রতিক আর্থিক তথ্য অনুযায়ী, দলের মোট সম্পদের পরিমাণ এক হাজার কোটিরও বেশি টাকা। এর মধ্যে রয়েছে স্থাবর সম্পত্তি, বিভিন্ন বিনিয়োগ এবং বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ।

যদি নির্বাচন কমিশন কোনও বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে প্রকৃত তৃণমূল কংগ্রেস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, তাহলে শুধু দলীয় প্রতীক নয়, আইনগতভাবে দলীয় সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণও সেই গোষ্ঠীর হাতে চলে যেতে পারে।

অর্থাৎ বিষয়টি শুধুমাত্র রাজনৈতিক মর্যাদার নয়; এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে বিপুল আর্থিক সম্পদ ও সাংগঠনিক অবকাঠামো।

অতীতে কোন কোন দলে এমন ঘটনা ঘটেছে?

শিবসেনা

মহারাষ্ট্রে শিবসেনা বিভক্ত হওয়ার পর একনাথ শিন্ডের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী দলীয় প্রতীকের অধিকার লাভ করে। ফলে প্রতিষ্ঠাতা বাল ঠাকরের পরিবারের হাত থেকে দলের নিয়ন্ত্রণ কার্যত সরে যায়।

এনসিপি

শরদ পাওয়ারের প্রতিষ্ঠিত এনসিপিও বিভক্ত হয়। পরবর্তীতে অজিত পাওয়ারের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী প্রতীক ও দলীয় স্বীকৃতির ক্ষেত্রে বড় সুবিধা পায়।

কংগ্রেস

১৯৬৯ সালে কংগ্রেস বিভক্ত হওয়ার পর ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন অংশ ধীরে ধীরে জনসমর্থন অর্জন করে এবং শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিকভাবে মূল ধারার কংগ্রেস হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।

আরও পড়ুন :  আফ্রিকা থেকে ভারতে ইবোলার আশঙ্কা? জয়পুরের ঘটনায় বাড়ছে উদ্বেগ!

এআইএডিএমকে

এমজি রামাচন্দ্রনের মৃত্যুর পর এআইএডিএমকে-তে নেতৃত্ব নিয়ে সংঘাত দেখা দিলেও শেষ পর্যন্ত জয়ললিতা নিজের অবস্থান শক্তিশালী করতে সক্ষম হন।

কমিউনিস্ট পার্টি

১৯৬৪ সালে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি বিভক্ত হয়ে দুটি আলাদা দলে পরিণত হয়। যদিও মতাদর্শগত পার্থক্য ছিল, পরে উভয় দলই বাম রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে টিকে থাকে।

মমতা ব্যানার্জীর সামনে কী চ্যালেঞ্জ?

বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো আদৌ নির্বাচন কমিশনের কাছে আনুষ্ঠানিক দাবি জানাবে কি না।

যতক্ষণ পর্যন্ত কোনও গোষ্ঠী নিজেদের প্রকৃত তৃণমূল কংগ্রেস দাবি করে কমিশনের দ্বারস্থ না হচ্ছে, ততক্ষণ প্রতীক বা সম্পত্তি নিয়ে আইনি প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

তবে যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ জনপ্রতিনিধি ও সাংগঠনিক নেতৃত্ব কোনও বিকল্প গোষ্ঠীর পাশে দাঁড়ায়, তাহলে মমতা ব্যানার্জীর নেতৃত্বাধীন শিবিরের জন্য পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

তৃণমূল কংগ্রেসের বর্তমান সংকট শুধু একটি রাজনৈতিক বিরোধ নয়; এটি দলীয় পরিচয়, নেতৃত্ব, প্রতীক এবং হাজার কোটি টাকার সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নও। ভারতের নির্বাচন আইন অনুযায়ী, কোনও গোষ্ঠী যদি নিজেদের প্রকৃত তৃণমূল হিসেবে দাবি করে নির্বাচন কমিশনের কাছে যায়, তাহলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা, সাংগঠনিক সমর্থন এবং দলীয় সংবিধানের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

সেই কারণে আগামী দিনে তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, গোটা ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনেই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে। দলীয় প্রতীক ও সম্পত্তির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে শেষ পর্যন্ত কোন গোষ্ঠী নিজেদের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক শক্তি বেশি কার্যকরভাবে প্রমাণ করতে পারে তার ওপর।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আর্কাইভ