যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বহুল আলোচিত ‘হোয়াইট হাউস বলরুম’ নির্মাণ প্রকল্পে বড় ধরনের আইনি বাধা তৈরি হয়েছে। হোয়াইট হাউসের পূর্ব পাশে প্রায় ৪০ কোটি ডলার ব্যয়ে বিশাল আকারের একটি বলরুম নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল ট্রাম্প প্রশাসন। তবে সেই প্রকল্পের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে করা মামলায় ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের একটি ফেডারেল আপিল আদালত।
আদালতের এই সিদ্ধান্তের ফলে হোয়াইট হাউসের ইস্ট উইং ভেঙে নতুন স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা আপাতত অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। একই সঙ্গে ঐতিহাসিক হোয়াইট হাউস ভবনে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার সীমা নিয়েও নতুন করে বিতর্ক সামনে এসেছে।
শুক্রবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউ.এস. কোর্ট অব অ্যাপিলস ফর দ্য ডিস্ট্রিক্ট অব কলাম্বিয়া সার্কিট এ সংক্রান্ত বিষয়ে রায় ঘোষণা করেন। তিন জন বিচারপতির বেঞ্চের মধ্যে দুজনই প্রকল্পের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলেছেন, হোয়াইট হাউস কোনো প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত সম্পদ নয় এবং এই ভবনে বড় ধরনের নির্মাণকাজের সিদ্ধান্ত গ্রহন করার ক্ষেত্রে কংগ্রেসের ভূমিকা রয়েছে।
আপিল আদালতের রায়ে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা ও হোয়াইট হাউসের গুরুত্ব নিয়ে মন্তব্য করা হয়েছে। বিচারপতিরা জানিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টরা হোয়াইট হাউসে নির্দিষ্ট মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন। যার কারনে ভবনটির মালিকানা বা এর কাঠামোতে পরিবর্তন আনার একক অধিকার তাদের নেই।
আদালতের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রত্যেক প্রেসিডেন্টের মনে রাখা প্রয়োজন যে তিনি হোয়াইট হাউসে সাময়িকভাবে দায়িত্ব পালন করছেন, ভবনটির মালিক হিসেবে নয়। তাই সেখানে বড় আকারের কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত কেবল নির্বাহী বিভাগের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করতে পারে না।
বিশেষ করে হোয়াইট হাউসের মতো ঐতিহাসিক ও জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন স্থাপনার কাঠামোগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন বলে আদালত মত দিয়েছেন।
এই পর্যবেক্ষণকে শুধু একটি নির্মাণ প্রকল্পের বিষয়ে আদালতের সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্ট অনেকে। কারণ, এর মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা এবং কংগ্রেসের সাংবিধানিক কর্তৃত্বের সীমারেখা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উদ্যোগে হোয়াইট হাউসের পূর্ব দিকের ইস্ট উইং ভেঙে সেখানে একটি বিশাল বলরুম নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। প্রস্তাবিত স্থাপনাটির আয়তন প্রায় ৯০ হাজার বর্গফুট। প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৪০ কোটি ডলার।
ট্রাম্প প্রশাসনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন এই স্থাপনাটি শুধু আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান আয়োজনের জায়গা হিসেবে ব্যবহৃত হবে না। এর সঙ্গে নিরাপত্তা ও জরুরি ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন সুবিধাও যুক্ত করার পরিকল্পনা ছিল।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত স্থাপনাটির নকশায় নিরাপত্তাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সম্ভাব্য হামলা মোকাবিলায় বিভিন্ন সুরক্ষা ব্যবস্থা, চিকিৎসা সুবিধা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে ব্যবহারের উপযোগী অবকাঠামো রাখার কথা বলা হয়েছে।
এমন একটি বড় প্রকল্প হাতে নেওয়ার আগে কংগ্রেসের অনুমতি না নেওয়ার কারনে এই বিষয়টিই শেষ পর্যন্ত আদালতের মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠেছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের বলরুম নির্মাণ পরিকল্পনার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আদালতের দ্বারস্থ হয় ন্যাশনাল ট্রাস্ট ফর হিস্টোরিক প্রিজারভেশন নামের একটি সংগঠন।
সংগঠনটির মূল উদ্বেগ ছিল ঐতিহাসিক হোয়াইট হাউস ভবনের কাঠামো ও ঐতিহ্য রক্ষা। তাদের যুক্তি ছিল, হোয়াইট হাউস যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস ও রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি স্থাপনা। ফলে এর একটি বড় অংশ ভেঙে নতুন ও বিশাল স্থাপনা নির্মাণের মতো সিদ্ধান্ত কেবল প্রশাসনিক নির্দেশের মাধ্যমে নেওয়া উচিত নয়।
এই আইনি চ্যালেঞ্জ শেষ পর্যন্ত কলাম্বিয়া জেলা সার্কিটের ফেডারেল আপিল আদালতে গড়ায়। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর শুক্রবার আদালত তার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন।
তিন বিচারপতির বেঞ্চে দুই বিচারপতি প্রকল্পটির বিরুদ্ধে রায় দেন। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের পরিকল্পনায় বড় ধরনের আইনি প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়।
আদালতের সিদ্ধান্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো হোয়াইট হাউসে বড় ধরনের নির্মাণকাজের বিষয়ে কংগ্রেসের ক্ষমতার কথা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা।
বিচারপতিরা মনে করেন, নির্বাহী বিভাগ নিজের সিদ্ধান্তে হোয়াইট হাউসের ঐতিহাসিক কাঠামোয় এমন বড় পরিবর্তন করতে পারে না। বিশেষ করে ৯০ হাজার বর্গফুটের মতো বিশাল একটি নতুন স্থাপনা নির্মাণের বিষয়টি শুধু প্রেসিডেন্টের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
এই অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে চলমান আলোচনাকেও নতুন মাত্রা দিয়েছে। দেশটির শাসনব্যবস্থায় প্রেসিডেন্ট, কংগ্রেস ও আদালতের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। হোয়াইট হাউস বলরুম প্রকল্পের মামলা সেই ভারসাম্যের প্রশ্নটিকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।
ফেডারেল আপিল আদালতের রায়ের পরও ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তারা চাইলে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করতে পারবেন।
তবে আবেদন করার নির্দিষ্ট সময়সীমা রয়েছে। এ রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার জন্য ১৪ দিন সময় রয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের হাতে ।
এই সময়ের মধ্যে ট্রাম্পের আইনজীবীরা যদি সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেন, তাহলে বিষয়টি নতুন করে সর্বোচ্চ আদালতের বিবেচনায় যেতে পারে। অন্যথায় আপিল আদালতের সিদ্ধান্তই কার্যকরভাবে চূড়ান্ত হয়ে উঠবে।
এর কারণে পরবর্তি ১৪ দিন এই প্রকল্পের ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়েছে।
আদালতের রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে ন্যাশনাল ট্রাস্ট ফর হিস্টোরিক প্রিজারভেশন। সংগঠনটির প্রেসিডেন্ট ব্রেন্ট লেগস এই সিদ্ধান্তকে ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন।
রায়ের প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, হোয়াইট হাউসসহ যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর বিষয়ে মতামত প্রকাশ এবং সেগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার মার্কিন নাগরিকদের রয়েছে।
তার মতে, আদালতের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নাগরিকদের সেই অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তিনি এই দিনটিকে যুক্তরাষ্ট্র ও দেশটির জনগণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন হিসেবে উল্লেখ করেন।
মামলাকারী সংগঠনটির বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে তারা শুধু একটি নির্মাণ প্রকল্প বন্ধ করার জন্য আদালতে যায়নি। বরং ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণ এবং এসব স্থাপনার ভবিষ্যৎ নিয়ে সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে জনস্বার্থ ও আইনের গুরুত্ব প্রতিষ্ঠা করাই তাদের লক্ষ্য।
অন্যদিকে আদালতের সিদ্ধান্তে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি আপিল আদালতের রায়কে অন্যায্য এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মন্তব্য করেছেন।
শুক্রবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প জানান, তিনি এই সিদ্ধান্ত মেনে নিচ্ছেন না এবং সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
ট্রাম্পের দাবি, প্রস্তাবিত বলরুমকে শুধু অনুষ্ঠান আয়োজনের জায়গা হিসেবে দেখলে প্রকল্পটির প্রকৃত উদ্দেশ্য বোঝা যাবে না। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এটি একই সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা অবকাঠামো হিসেবেও কাজ করবে।
তিনি দাবি করেছেন, পরিকল্পিত স্থাপনাটিতে বোমা আশ্রয় নেওয়ার সুবিধা, চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের মতো সম্ভাব্য হুমকি থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রেসিডেন্টে ডোনাল্ড ট্রাম্প আরও অভিযোগ করেছেন, এ সিদ্ধান্তের কারণে হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তা, কর্মী ও দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে থাকতে পারে।
তিনি সুপ্রিম কোর্টে আপিল করার কথা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন। পাশাপাশি তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, সর্বোচ্চ আদালত আপিল আদালতের সিদ্ধান্ত বাতিল করবেন।
হোয়াইট হাউস বলরুম প্রকল্প নিয়ে বিতর্কের পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, প্রকল্পটির ব্যয় অনেক বেশি। প্রায় ৪০ কোটি ডলারের এই নির্মাণকাজ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে।
দ্বিতীয়ত, প্রকল্পটির ইস্ট উইং ভেঙে ফেলার পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। হোয়াইট হাউসের এই অংশটি অনেক ধরে প্রশাসনিক কার্যক্রমের সাথে যুক্ত। এর ফলে এর কাঠামোগত পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক আলোচনার সূত্রপাত ঘটেছে ।
তৃতীয়ত, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই এমন একটি প্রকল্প শুরু করা হয়েছে কি না, সেটিই আদালতের কাছে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আপিল আদালতের রায়ে এই বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
আর চতুর্থত, হোয়াইট হাউস শুধু একটি সরকারি ভবন নয়। এটি যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও ইতিহাসের অন্যতম প্রতীক। ফলে এর কাঠামো পরিবর্তনের যেকোনো উদ্যোগ সাধারণ সরকারি ভবনের সংস্কার প্রকল্পের তুলনায় অনেক বেশি সংবেদনশীল।
আদালতের রায়ের পর এখন মূল নজর সুপ্রিম কোর্টের দিকে। ট্রাম্প প্রশাসন যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ আদালতে আবেদন করে, তাহলে বলরুম প্রকল্প নিয়ে আইনি লড়াই আরও দীর্ঘ হতে পারে।
তথ্য সূত্র: রয়টার্স


