বঙ্গোপসাগরে বড়সড় দুর্ঘটনা। ওড়িশা উপকূল থেকে প্রায় ২৪০ নটিক্যাল মাইল দূরে ডুবে গেল পানামার পতাকাধারী একটি পণ্যবাহী জাহাজ। দুর্ঘটনার পর জাহাজে থাকা ২৪ জন নাবিক ও ক্রুর সন্ধানে ব্যাপক তল্লাশি অভিযান শুরু হয়েছে। উদ্ধারকাজে যোগ দিয়েছে ভারতীয় কোস্ট গার্ড ও ভারতীয় নৌবাহিনী।
জাহাজটির নাম এমভি ওশান-উইনার। জানা গেছে, ওড়িশার পারাদ্বীপ বন্দর থেকে লৌহ আকরিক নিয়ে সিঙ্গাপুরের উদ্দেশে যাত্রা করেছিল জাহাজটি। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছনোর আগেই বঙ্গোপসাগরে বিপদের মুখে পড়ে সেটি। শেষ পর্যন্ত জাহাজটি ডুবে যায়।
প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, এমভি ওশান-উইনার জাহাজে মোট ২৪ জন ক্রু সদস্য ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ২০ জন চিনের নাগরিক। এছাড়া ছিলেন মায়ানমারের তিন নাগরিক এবং বাংলাদেশের একজন নাগরিক।
পারাদ্বীপ বন্দর থেকে প্রায় ১৭০০ টন লৌহ আকরিক নিয়ে সিঙ্গাপুরের দিকে যাচ্ছিল জাহাজটি। সমুদ্রে যাত্রার সময় আচমকাই জাহাজটির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপরই বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।
শ্রী বিজয়া পুরমের মেরিটাইম রেসকিউ কোঅর্ডিনেশন সেন্টার বা এমআরসিসি-র কাছে খবর পৌঁছতেই শুরু হয় উদ্ধার তৎপরতা। জাহাজ পরিচালনাকারী সংস্থা ভিক্টরি স্টার গ্রুপ কোং লিমিটেড শনিবার বেলা ১১টা ৪৮ মিনিট নাগাদ জাহাজটির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার কথা জানায়।
এরপর দ্রুত ভারতীয় উদ্ধারকারী সংস্থাগুলির সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।
জাহাজটির খোঁজে দ্রুত অভিযান শুরু করে ভারতীয় কোস্ট গার্ড। উদ্ধারকাজে পাঠানো হয় দুটি জাহাজ—‘বরদ’ এবং ‘অনমোল’। পাশাপাশি শ্রী বিজয়া পুরম থেকে ‘বিজিত’ নামের আরও একটি জাহাজকে ঘটনাস্থলের দিকে পাঠানো হয়।
সমুদ্রে বিপদের ক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার খবর পাওয়ার পরই উদ্ধারকারী জাহাজগুলিকে সক্রিয় করা হয়। আশপাশে থাকা অন্যান্য জাহাজগুলিকেও সতর্ক করা হয়েছে।
উদ্ধারকারী সংস্থাগুলির পক্ষ থেকে ওই অঞ্চলে থাকা জাহাজগুলিকে তল্লাশি অভিযানে সহযোগিতা করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। নিখোঁজ নাবিকদের দ্রুত খুঁজে বের করাই এখন প্রধান লক্ষ্য।
এমভি ওশান-উইনারে থাকা ২৪ জন ক্রু সদস্যের পরিচয়ও সামনে এসেছে। জানা গেছে, তাঁদের মধ্যে ২০ জন চিনের নাগরিক। তিনজন মায়ানমারের এবং একজন বাংলাদেশের নাগরিক।
ফলে এই দুর্ঘটনার সঙ্গে একাধিক দেশের নাগরিকের নিরাপত্তা জড়িয়ে রয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের একজন নাগরিক ওই জাহাজে থাকায় বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশের কাছেও উদ্বেগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে এখনও পর্যন্ত নিখোঁজ নাবিকদের মধ্যে ঠিক কতজনকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
এক সিনিয়র আইপিএস আধিকারিক সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে জানিয়েছেন, এখনও পর্যন্ত কতজন ক্রু সদস্যকে উদ্ধার করা হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। অর্থাৎ উদ্ধার অভিযান চললেও প্রত্যেক নাবিকের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য এখনও পাওয়া যায়নি।
সমুদ্রের প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নিখোঁজদের সন্ধান চালানো অত্যন্ত কঠিন। বিশেষ করে জাহাজটি যেখানে ডুবে গেছে, সেটি ওড়িশা উপকূল থেকে অনেকটা দূরে। ফলে উদ্ধারকারী দলগুলিকে দীর্ঘ সময় ধরে সমুদ্রে তল্লাশি চালাতে হচ্ছে।
এই দুর্ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলির একটি হল, ঠিক কী কারণে এমভি ওশান-উইনারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।
এখনও পর্যন্ত দুর্ঘটনার নির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে কোনও চূড়ান্ত তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি। জাহাজটি ডুবে যাওয়ার আগে সেখানে কী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
আবহাওয়া, সমুদ্রের ঢেউ, জাহাজের যান্ত্রিক সমস্যা কিংবা অন্য কোনও কারণ দুর্ঘটনার পেছনে ছিল কি না, তা তদন্তের পরই পরিষ্কার হতে পারে।
শেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী, নিখোঁজ ২৪ নাবিকের সন্ধানে তল্লাশি অভিযান এখনও চলছে। ভারতীয় কোস্ট গার্ডের পাশাপাশি ভারতীয় নৌবাহিনীও উদ্ধার তৎপরতায় যুক্ত হয়েছে।
ঘটনাস্থলের আশপাশে থাকা জাহাজগুলিকেও তল্লাশিতে যুক্ত করার চেষ্টা চলছে। উদ্ধারকারী দল সমুদ্রপথে নিখোঁজদের সন্ধান চালাচ্ছে।
এখন সবচেয়ে বড় আশঙ্কা নিখোঁজ নাবিকদের নিরাপত্তা নিয়ে। তবে উদ্ধারকারী সংস্থাগুলি দ্রুত অভিযান শুরু করায় তাঁদের সন্ধান পাওয়ার আশা এখনও রয়েছে।
বঙ্গোপসাগরে এই দুর্ঘটনা ফের একবার দেখিয়ে দিল, গভীর সমুদ্রে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে কতটা ঝুঁকি থাকে। এমভি ওশান-উইনারের দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং ২৪ নাবিকের পরিণতি জানতে এখন উদ্ধার অভিযান ও তদন্তের পরবর্তী আপডেটের দিকেই নজর সবার।


