আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : উত্তর নেপালের রসুয়া জেলায় ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পর সামনে এসেছে একের পর এক প্রশ্ন। হঠাৎ এত বিপুল জলরাশি কোথা থেকে এল? কেন কয়েক মুহূর্তের মধ্যে নদীর স্রোত এতটা ভয়ংকর হয়ে উঠল? এর পেছনে কি ছিল ভূমিকম্প, নাকি হিমালয়ের উচ্চভূমিতে ঘটে যাওয়া তুষারধস?
বুধবার সকালের ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ মহলেও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। আকাশে ঘুরছিল একের পর এক হেলিকপ্টার। নিচে পানিতে তলিয়ে ছিল বিস্তীর্ণ এলাকা। বিপন্ন মানুষ সাহায্যের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু পানির উচ্চতা ও চারপাশের পরিস্থিতি এতটাই বিপজ্জনক ছিল যে উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার নামিয়ে মানুষকে সরিয়ে নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল, যদি গত ২৪ ঘণ্টায় উত্তর নেপালে উল্লেখযোগ্য মেঘভাঙা বৃষ্টির ঘটনা না ঘটে থাকে, তাহলে এত বিপুল পানি এল কোথা থেকে?
ভূবিজ্ঞানী ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে এর সম্ভাব্য একটি ব্যাখ্যা সামনে এসেছে। তাঁদের ধারণা, পাহাড়ি এলাকায় তুষারধস বা ভূমিধসের কারণে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ সাময়িকভাবে আটকে গিয়ে সেখানে বিপুল পরিমাণ পানি জমেছিল। পরে সেই প্রাকৃতিক বাধা ভেঙে গেলে একসঙ্গে বিশাল জলরাশি নিচের দিকে ধেয়ে আসে। আর সেই আকস্মিক স্রোতই ভয়াবহ হড়পা বানের পরিস্থিতি তৈরি করে থাকতে পারে।
কাঠমান্ডুর ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে হিমবাহ থেকে তুষারধসের সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে।
পাহাড়ি এলাকায় এ ধরনের ঘটনা অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ একটি বড় তুষারধসের সঙ্গে বরফ, পাথর ও মাটি নিচে নেমে এসে নদীর গতিপথ আটকে দিতে পারে। নদীর পানি তখন স্বাভাবিক পথে বের হতে না পেরে ওই এলাকায় জমতে থাকে।
প্রথম দিকে বাইরে থেকে পরিস্থিতি খুব অস্বাভাবিক মনে নাও হতে পারে। কিন্তু নদীর পেছনে পানি জমতে থাকলে ধীরে ধীরে চাপ বাড়তে থাকে। একসময় জমে থাকা পানি যদি প্রাকৃতিক বাধা ভেঙে বেরিয়ে আসে, তখন তৈরি হতে পারে ভয়ংকর আকস্মিক বন্যা।
রসুয়া জেলার ঘটনাতেও এমন কোনো প্রক্রিয়া কাজ করেছে কি না, সেটিই এখন বিশেষজ্ঞদের অন্যতম আলোচনার বিষয়।
এই বিপর্যয়ে বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে লেন্ডে খোলা নদী। বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীটির গতিপথে কোনো ধরনের প্রাকৃতিক বাধা তৈরি হয়ে থাকলে সেখানে সাময়িকভাবে পানি আটকে যেতে পারে।
জলবায়ু গবেষক শাশ্বত সান্যালের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গত ১৪ মাসে লেন্ডে নদী এলাকায় পরপর দুবার বন্যার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ফলে নদী ও আশপাশের ভূপ্রকৃতির ওপরও তার প্রভাব পড়ে থাকতে পারে।
এবার যদি তুষারধস বা পাথরের স্তূপ নদীর গতিপথ আটকে দিয়ে থাকে, তাহলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ দীর্ঘ সময় ধরে পানি জমার পর হঠাৎ সেই বাধা ভেঙে গেলে স্বাভাবিক বন্যার তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী স্রোত তৈরি হতে পারে।
এই স্রোতের সঙ্গে পাথর, বরফ, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ যুক্ত হলে তা কয়েক মিনিটের মধ্যে রাস্তা, সেতু, ঘরবাড়ি ও অন্যান্য স্থাপনা ভাসিয়ে নিতে পারে।
নেপালের এই বিপর্যয় নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে বৃষ্টিপাতকে ঘিরে। সাধারণত পাহাড়ি এলাকায় ভয়াবহ বন্যার সঙ্গে অতিবৃষ্টির সম্পর্ক থাকে। কিন্তু এবার উত্তর নেপালে ঘটনার আগের রাতে বড় ধরনের মেঘভাঙা বৃষ্টির খবর পাওয়া যায়নি।
এই তথ্যই বিশেষজ্ঞদের অন্য সম্ভাবনার দিকে তাকাতে বাধ্য করছে।
ভূগোল গবেষক মধুসূদন কর্মকারের পর্যবেক্ষণেও উঠে এসেছে, মঙ্গলবার রাতে উত্তর নেপালে মেঘভাঙা বৃষ্টির তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে উপগ্রহচিত্রে তিব্বত অঞ্চলে অতিভারী বৃষ্টির ইঙ্গিত রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
তাই তিব্বতের উচ্চভূমিতে ভারী বৃষ্টি, তুষারধস এবং নদীর গতিপথে সাময়িক বাধা—এই কয়েকটি ঘটনা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
হিমালয় কোনো এক দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একই পর্বতশ্রেণির নদী ও হিমবাহের ওপর একাধিক দেশের পরিবেশ ও মানুষের জীবন নির্ভরশীল। ফলে তিব্বতের উচ্চভূমিতে কোনো বড় প্রাকৃতিক ঘটনা ঘটলে তার প্রভাব নিচের দিকে নেপাল বা অন্য অঞ্চলেও পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের একটি অংশের ধারণা, তিব্বতের কেরুং বা আশপাশের উঁচু এলাকায় তুষারধসের কারণে কোনো নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে থাকতে পারে। পরে সেই প্রাকৃতিক বাধা ভেঙে গেলে জমে থাকা পানি প্রবল গতিতে নেপালের দিকে নেমে আসে।
অবশ্য এই সম্ভাবনাগুলো এখনও তদন্ত ও পর্যবেক্ষণের বিষয়। স্যাটেলাইট ছবি, নদীর পানির প্রবাহ, পাহাড়ের ভূপ্রকৃতি এবং ঘটনাস্থলের ক্ষয়ক্ষতির ধরন বিশ্লেষণ করেই প্রকৃত কারণ সম্পর্কে আরও নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।
ঘটনার পর তিব্বত অঞ্চলে ভূমিকম্পের কথাও সামনে এসেছে। একই সময়ে সেখানে কোনো ভূমিকম্প হয়েছিল কি না এবং সেটির সঙ্গে নেপালের বন্যার কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।
তবে ভূগোল গবেষক মধুসূদন কর্মকার জানিয়েছেন, তিনি ভূমিকম্পের সঙ্গে এই ঘটনার সরাসরি সম্পর্কের কোনো তথ্য পাচ্ছেন না।
অন্যদিকে কিছু প্রতিবেদনে তিব্বত অংশে প্রায় একই সময়ে ভূমিকম্পের উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে ভূমিকম্প আদৌ নদীর গতিপথ পরিবর্তন, তুষারধস বা প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরিতে কোনো ভূমিকা রেখেছিল কি না, তা আরও বিশদভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
অর্থাৎ এই মুহূর্তে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না যে ভূমিকম্পই নেপালের ভয়াবহ বিপর্যয়ের মূল কারণ। বরং তুষারধস, নদীর গতিপথ বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং পরে জমে থাকা পানির আকস্মিক মুক্তিকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয় শুধু একটি দিনের দুর্যোগ নয়, বরং হিমালয় অঞ্চলের পরিবেশগত পরিবর্তন নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, হিমালয় অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, হিমবাহের পরিবর্তন এবং বরফের স্থিতিশীলতায় পরিবর্তন পাহাড়ি জনপদের জন্য নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
তুষার ও বরফের স্তর অস্থিতিশীল হয়ে পড়লে বড় ধরনের তুষারধসের আশঙ্কা বাড়ে। আবার হিমবাহ ও বরফ গলার পানি কোনো নিম্নাঞ্চলে জমে হ্রদ তৈরি করলে সেই হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকিও থাকে। একে ঘিরে তৈরি হতে পারে অত্যন্ত শক্তিশালী আকস্মিক বন্যা।
নেপালের মতো পাহাড়ি দেশে এমন ঘটনা স্থানীয় মানুষের পাশাপাশি পর্যটক ও তীর্থযাত্রীদের জন্যও বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে।
রসুয়া জেলার ভয়াবহ পরিস্থিতি তাই শুধু একটি আকস্মিক বন্যার ঘটনা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, নদীর গতিপথ, তুষারধস, হিমবাহ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো একাধিক বিষয়।
এখন বিশেষজ্ঞদের প্রধান কাজ হলো বিপর্যয়ের প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করা। কোন এলাকায় তুষারধস হয়েছিল, কোথায় নদীর গতিপথ আটকে গিয়েছিল, কতটা পানি জমেছিল এবং কীভাবে সেই বাধা ভেঙে প্রবল স্রোত তৈরি হলো—এসব প্রশ্নের উত্তর মিললেই ঘটনার পুরো রহস্য পরিষ্কার হবে।
তবে একটি বিষয় ইতিমধ্যেই স্পষ্ট। হিমালয়ের মতো সংবেদনশীল অঞ্চলে প্রাকৃতিক পরিবেশের সামান্য পরিবর্তনও কখনও কখনও ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। নেপালের এই ঘটনা সেই ঝুঁকিরই এক ভয়ংকর উদাহরণ হয়ে সামনে এসেছে।


