খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeএক্সক্লুসিভইভা পেরনের মরদেহের রহস্য: ইতালিতে গোপন কবর থেকে আর্জেন্টিনায় ফেরার কাহিনি

ইভা পেরনের মরদেহের রহস্য: ইতালিতে গোপন কবর থেকে আর্জেন্টিনায় ফেরার কাহিনি

ইভিটার মরদেহ প্রথমে আর্জেন্টিনার শ্রম মন্ত্রণালয়ের ভবনে রাখা হয়। সেখানে শ্রমিকদের জন্য একটি বিশাল স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। সেই স্মৃতিস্তম্ভের অংশ হিসেবে কাচের কফিনে ইভিটার মরদেহ রাখার কথা ভাবা হয়েছিল।

আর্জেন্টিনার ইতিহাসে এমন কিছু ঘটনা রয়েছে, যা রাজনীতি, ক্ষমতা, বিশ্বাস আর রহস্যকে এক সুতোয় বেঁধে দিয়েছে। ইভা পেরনের মরদেহ ঘিরে তৈরি হওয়া কাহিনি তেমনই এক অবিশ্বাস্য অধ্যায়। মৃত্যুর পরও যেন শেষ হয়নি তার রাজনৈতিক জীবন। বরং মৃত্যুর পর তার মরদেহই হয়ে উঠেছিল ক্ষমতার লড়াইয়ের অন্যতম প্রতীক।

ইভা পেরন, যিনি মানুষের কাছে ‘ইভিটা’ নামে বেশি পরিচিত ছিলেন, ১৯৫২ সালের ২৬ জুলাই মাত্র ৩৩ বছর বয়সে মারা যান। জরায়ুমুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত এই নারী জীবিত অবস্থাতেই আর্জেন্টিনার দরিদ্র ও শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে অসাধারণ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। কিন্তু মৃত্যুর পর তার মরদেহকে ঘিরে যা ঘটেছিল, তা ছিল আরও নাটকীয়।

তার মরদেহ চুরি করা হয়। এরপর বছরের পর বছর সেটি এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরানো হয়। কখনো সামরিক গোয়েন্দাদের নিয়ন্ত্রণে, কখনো শহরের রাস্তায় একটি ভ্যানে, আবার কখনো ইতালির একটি কবরস্থানে লুকিয়ে রাখা হয়। শেষ পর্যন্ত ১৬ বছরের দীর্ঘ যাত্রা শেষে ইভিটার মরদেহ ফিরে আসে আর্জেন্টিনায়।

ইভা পেরনের মৃত্যুর পর শুরু হয়েছিল মরদেহ সংরক্ষণের কাজ

ইভা পেরনের মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তার মরদেহ সংরক্ষণের কাজ শুরু করেন স্প্যানিশ অ্যানাটমিস্ট ডক্টর পেদ্রো আরা। উদ্দেশ্য ছিল এমনভাবে দেহ সংরক্ষণ করা, যাতে দীর্ঘ সময় পরও তা প্রায় জীবন্ত মানুষের মতো দেখায়।

এর পেছনে শুধু আবেগ ছিল না, ছিল রাজনীতিও। ইভিটার স্বামী প্রেসিডেন্ট হুয়ান পেরন বুঝতে পেরেছিলেন, তার স্ত্রী সাধারণ কোনো রাজনৈতিক নেতার স্ত্রী ছিলেন না। শ্রমজীবী মানুষ ও দরিদ্রদের কাছে ইভা ছিলেন এক ধরনের প্রতীক।

তাই তার মৃত্যুর পরও সেই জনপ্রিয়তাকে ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছিল।

ইভিটার মরদেহ প্রথমে আর্জেন্টিনার শ্রম মন্ত্রণালয়ের ভবনে রাখা হয়। সেখানে শ্রমিকদের জন্য একটি বিশাল স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। সেই স্মৃতিস্তম্ভের অংশ হিসেবে কাচের কফিনে ইভিটার মরদেহ রাখার কথা ভাবা হয়েছিল।

কিন্তু রাজনৈতিক পরিস্থিতি খুব দ্রুত বদলে যায়।

পেরন সরকারের পতন এবং ইভিটার মরদেহ সরিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত

১৯৫৫ সালের সেপ্টেম্বরে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে হুয়ান পেরন ক্ষমতাচ্যুত হন। তাকে দেশ ছাড়তে হয়। নতুন সামরিক সরকার পেরনবাদ বা পেরনিজমের সব ধরনের প্রতীক মুছে ফেলার উদ্যোগ নেয়।

এই পরিস্থিতিতে ইভা পেরনের মরদেহ নতুন সরকারের কাছে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে ওঠে।

কারণ জীবিত অবস্থায় ইভা ছিলেন পেরনপন্থিদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। তার মরদেহ যদি প্রকাশ্যে থাকে, তাহলে সেটি পেরনপন্থিদের আন্দোলনের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে—এমন আশঙ্কা ছিল সামরিক সরকারের।

ফলে রাতারাতি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, ইভিটার মরদেহ সরিয়ে ফেলতে হবে।

এভাবেই শুরু হয় ইতিহাসের অন্যতম রহস্যময় মরদেহ-যাত্রা।

ভ্যান থেকে সামরিক গোয়েন্দা দপ্তর—বারবার বদলেছে আশ্রয়

ইভিটার মরদেহ সরিয়ে নেওয়ার দায়িত্বে থাকা সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বুঝতে পারছিলেন, এটি সাধারণ কোনো মৃতদেহ নয়। পেরনপন্থিরা মরদেহটি খুঁজে বের করার চেষ্টা করতে পারে।

তাই এক জায়গায় রেখে দেওয়ার বদলে কফিনটি বারবার স্থানান্তর করা হতো।

বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী, কখনো রাজধানী বুয়েনস আইরেসের রাস্তায় পার্ক করে রাখা একটি ভ্যানের মধ্যে কফিন রাখা হয়েছিল। কখনো সেটি লুকিয়ে রাখা হয়েছিল সিনেমা হলের পেছনে। আবার কখনো শহরের পানির সরবরাহ ব্যবস্থার কাছাকাছি কোনো জায়গায় রাখা হয়েছিল বলে কথিত আছে।

অদ্ভুত ব্যাপার হলো, যেখানে ইভিটার কফিন রাখা হতো, সেখানেই অনেক সময় ফুল ও মোমবাতি পাওয়া যেত। কে বা কারা এসব রেখে যেত, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।

এতে বোঝা যায়, ইভিটার প্রতি সাধারণ মানুষের আবেগ কতটা গভীর ছিল।

মরদেহের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাকে ঘিরে রহস্য

ইভিটার মরদেহের দায়িত্বে থাকা সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল কার্লোস মুরি কেনিগকে ঘিরেও নানা গল্প ছড়িয়ে পড়ে।

কিছু বর্ণনায় বলা হয়, মরদেহটির দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি ইভিটার প্রতি অস্বাভাবিকভাবে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলেন। তবে ইতিহাসবিদদের মতে, এই ঘটনার অনেক অংশই পরে কিংবদন্তি ও রাজনৈতিক প্রচারণার সঙ্গে মিশে যায়।

আর্জেন্টিনার ইতিহাস নিয়ে গবেষণাকারীরা বহুবার সতর্ক করেছেন যে, ইভিটাকে ঘিরে প্রচলিত গল্পের সবকিছু সমানভাবে যাচাই করা সম্ভব নয়। সত্য ঘটনা, রাজনৈতিক প্রচারণা এবং লোকমুখে ছড়িয়ে পড়া কাহিনি—সবকিছু মিলেমিশে গেছে।

তবে একটি বিষয় নিয়ে সন্দেহ কম। সামরিক সরকার সত্যিই ইভিটার মরদেহকে পেরনবাদী রাজনীতির প্রতীক হিসেবে ভয় পেত।

ইতালির মিলানে গোপন কবর

১৯৫৭ সালের দিকে ইভিটার মরদেহ আর্জেন্টিনা থেকে সরিয়ে ইতালিতে পাঠানো হয়। সেখানে মিলানের একটি কবরস্থানে ভুয়া পরিচয়ে তাকে সমাহিত করা হয়।

তার কবরের পরিচয় ছিল ‘মারিয়া মাজ্জি দে মাজিসত্রিস’।

এদিকে আর্জেন্টিনায় ইভিটার সমর্থকেরা তাকে ভুলে যায়নি। বরং তার মরদেহ কোথায়, সেটিই হয়ে ওঠে পেরনপন্থিদের অন্যতম বড় প্রশ্ন।

বুয়েনস আইরেসের বিভিন্ন দেয়ালে লেখা হতে থাকে—ইভা পেরনের মরদেহ কোথায়?

এই প্রশ্ন শুধু একটি মৃতদেহের সন্ধান ছিল না। এর মধ্যে ছিল রাজনৈতিক পরিচয়, প্রতিবাদ এবং ক্ষমতার বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ।

মরদেহ গায়েব করেও কি ইভিটাকে থামানো গিয়েছিল?

ইতিহাসবিদদের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, ইভিটার মরদেহ সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত উল্টো তার রাজনৈতিক প্রতীকী শক্তিকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

কারণ সাধারণ মানুষের কাছে বিষয়টি দাঁড়ায়—একজন জনপ্রিয় নেত্রীর মৃত্যুর পরও তার মরদেহকে ভয় পাচ্ছে ক্ষমতাসীনরা।

ফলে ইভা পেরন ধীরে ধীরে শুধু একজন রাজনৈতিক নেত্রী নয়, বরং প্রতিরোধের প্রতীকে পরিণত হন।

১৯৭০-এর দশকের শুরুতে আর্জেন্টিনার রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসে। পেরনপন্থিদের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত ইভিটার মরদেহ হুয়ান পেরনের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

মাদ্রিদে হুয়ান পেরনের কাছে ফিরল ইভিটার মরদেহ

সেসময় হুয়ান পেরন স্পেনের মাদ্রিদের কাছে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছিলেন। ১৯৭১ সালে একটি রূপালী কফিনে করে ইভা পেরনের মরদেহ সেখানে পৌঁছে দেওয়া হয়।

বহু বছর পর স্বামীর কাছে ফিরে আসে ইভিটা।

তবে মরদেহটির অবস্থা আগের মতো ছিল না। দীর্ঘ সময়ের গোপন যাত্রা এবং নানা ঘটনার কারণে দেহের কিছু অংশে ক্ষতি হয়েছিল। ফলে পরে সেটি পুনরুদ্ধারের প্রয়োজন হয়।

এই দায়িত্ব দেওয়া হয় ডোমিঙ্গো তেইয়েচিয়াকে। তিনি মানুষের দেহাবশেষ ও বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শন পুনরুদ্ধারের কাজ করতেন।

তার জন্য কাজটি ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

তিনি পরে জানিয়েছিলেন, এ কাজের কারণে তাকে ফোনে হুমকি দেওয়া হয়েছিল। এমনকি তার গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছিল।

আর্জেন্টিনায় ফিরে এল ইভিটার মরদেহ

১৯৭৩ সালে হুয়ান পেরন আবার আর্জেন্টিনার ক্ষমতায় ফিরে আসেন। কিন্তু তার শাসন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ১৯৭৪ সালে তার মৃত্যু হলে ইভিটার মরদেহ আবার আর্জেন্টিনায় ফিরিয়ে আনা হয়।

তখন মরদেহটি সংরক্ষণ ও মেরামতের প্রয়োজন ছিল। ঝুঁকি সত্ত্বেও তেইয়েচিয়া সেই দায়িত্ব পালন করেন।

শেষ পর্যন্ত ১৯৭৬ সালের অক্টোবরে ইভা পেরনের মরদেহকে বুয়েনস আইরেসে চূড়ান্তভাবে সমাহিত করা হয়।

তবে এবার আর কোনো ঝুঁকি নেওয়া হয়নি।

পাঁচ মিটার গভীরে সুরক্ষিত সমাধি

ইভিটার মরদেহ রাখা হয় অত্যন্ত নিরাপদ একটি ক্রিপ্টে। এটি ছিল সাধারণ কবরের মতো নয়। সমাধিস্থলের নিচে একাধিক গোপন দরজা ও সুরক্ষিত কক্ষ রাখা হয়েছিল, যাতে ভবিষ্যতে কেউ সহজে কফিনে পৌঁছাতে না পারে।

মাটির প্রায় পাঁচ মিটার গভীরে রাখা হয় তার কফিন।

১৯৫২ সালে মৃত্যুর পর থেকে ১৯৭৬ সালে চূড়ান্ত সমাধি পর্যন্ত কেটে গেছে ২৪ বছর। এর মধ্যে ১৬ বছর ছিল মরদেহটির এক দীর্ঘ, রহস্যময় এবং রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ যাত্রার সময়।

ইভিটা কেন আজও ইতিহাসের এত বড় প্রতীক?

ইভা পেরনের গল্প শুধু একজন ফার্স্ট লেডির জীবনী নয়। এটি দেখায়, কখনো কখনো একজন মানুষের রাজনৈতিক প্রভাব মৃত্যুর পরও শেষ হয় না।

ইভা দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, শ্রমজীবীদের জন্য কাজ করেছিলেন এবং পেরন সরকারের জনকল্যাণমূলক রাজনীতির অন্যতম মুখ হয়ে উঠেছিলেন। তার জনপ্রিয়তা এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, ক্ষমতাসীন সরকার তার মরদেহ নিয়েও আতঙ্কিত হয়েছিল।

শেষ পর্যন্ত তাকে মাটির গভীরে নিরাপদ সমাধিতে রাখা গেলেও ইভিটাকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা যায়নি।

বরং তার মরদেহ চুরি, গোপন কবর, ইতালিতে নির্বাসন, মাদ্রিদে প্রত্যাবর্তন এবং শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনায় সমাধি—এই পুরো ঘটনা ইভা পেরনের কিংবদন্তিকে আরও শক্তিশালী করেছে।

তাই ইভিটাকে ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়তো আর ‘তার মরদেহ কোথায় ছিল?’ নয়। বরং প্রশ্নটি হলো—একজন মানুষ মৃত্যুর পরও কীভাবে একটি দেশের রাজনীতি ও মানুষের আবেগকে এত গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারেন?

ইভা পেরনের জীবন ও মৃত্যুর পরের ঘটনাগুলো সেই প্রশ্নেরই এক অসাধারণ উদাহরণ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আর্কাইভ