ভারতীয় ফুটবলকে ঘিরে দীর্ঘদিনের জল্পনার অবসান ঘটাল সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন (এআইএফএফ)। একই সময়ে এশিয়াড এবং পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ—দুটি গুরুত্বপূর্ণ সূচি সামনে থাকায় প্রশ্ন উঠেছিল, ভারত কি কোনও একটি প্রতিযোগিতা থেকে সরে দাঁড়াবে? অবশেষে সেই জল্পনায় ইতি টেনে ফেডারেশন জানিয়ে দিল, দুই টুর্নামেন্টেই অংশ নেবে ভারত। শুধু তাই নয়, এই দুই আসরের জন্য নামানো হবে দুটি পৃথক দল।
একই সঙ্গে অনূর্ধ্ব-১৫ বিশ্বকাপকে সামনে রেখে ভারতের জুনিয়র দলের কোচ ও ম্যানেজারের নামও ঘোষণা করেছে এআইএফএফ। কোচ হিসেবে দায়িত্ব পাচ্ছেন অভিজ্ঞ বিবিয়ানো ফার্নান্ডেজ এবং দলের ম্যানেজার হচ্ছেন মিনার্ভা একাডেমির কর্ণধার রঞ্জিত বাজাজ। এই সিদ্ধান্ত ভারতীয় ফুটবলে নতুন দিগন্তের সূচনা বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বৃহস্পতিবার নয়াদিল্লির ফুটবল হাউসে অনুষ্ঠিত এআইএফএফের কার্যকরী কমিটির বৈঠকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকের পর জানানো হয়, আগামী ৩ অক্টোবর কলকাতায় ফিফার আন্তর্জাতিক উইন্ডোর মধ্যে ব্রাজিলের বিরুদ্ধে প্রীতি ম্যাচ খেলবে ভারতীয় সিনিয়র দল।
অন্যদিকে, ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত ইন্দোনেশিয়ায় অনুষ্ঠিত হবে এশিয়াড ফুটবল প্রতিযোগিতা। দুটি সূচি প্রায় একই সময়ে হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছিল, ভারতের সেরা ফুটবলাররা কোন প্রতিযোগিতায় অংশ নেবেন।
ফেডারেশন সেই জটিলতার সহজ সমাধান করেছে। সিদ্ধান্ত হয়েছে, ব্রাজিল ম্যাচ এবং এশিয়াডের জন্য দুটি আলাদা স্কোয়াড তৈরি করা হবে। ফলে কোনও প্রতিযোগিতাকেই গুরুত্বহীন করে দেখা হচ্ছে না।
এআইএফএফের মতে, ব্রাজিলের মতো বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ফুটবল দলের বিরুদ্ধে মাঠে নামার সুযোগ ভারতীয় ফুটবলারদের জন্য বিরাট অভিজ্ঞতা হয়ে উঠবে। আন্তর্জাতিক মানের প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে খেললে খেলোয়াড়রা নিজেদের দক্ষতা যাচাই করতে পারবেন এবং ভবিষ্যতের বড় প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুতিও বাড়বে।
একই সঙ্গে এশিয়াডও ভারতের জন্য একটি মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক আসর। তাই কোনও ক্ষেত্রেই অংশগ্রহণ থেকে পিছিয়ে আসতে চায়নি ফেডারেশন। খুব শীঘ্রই ফিফা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলিকে সরকারি ভাবে জানিয়ে দেওয়া হবে যে ভারত উভয় প্রতিযোগিতাতেই অংশ নেবে।
কলকাতা দীর্ঘদিন ধরেই ভারতীয় ফুটবলের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। সেই শহরেই ব্রাজিলের মতো বিশ্বখ্যাত দলের বিরুদ্ধে ভারতীয় দলের ম্যাচ আয়োজন নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক হতে চলেছে।
বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি সমর্থকের প্রিয় ব্রাজিল দল যদি তাদের প্রথম সারির ফুটবলারদের নিয়ে মাঠে নামে, তাহলে ভারতীয় ফুটবলারদের জন্য এটি হবে এক বিরল অভিজ্ঞতা। সমর্থকরাও বহুদিন পর আন্তর্জাতিক মানের একটি বড় ম্যাচ উপভোগ করার সুযোগ পাবেন।
ফেডারেশন মনে করছে, এই ম্যাচ ভারতীয় ফুটবলের জনপ্রিয়তা আরও বাড়াবে এবং নতুন প্রজন্মের ফুটবলারদের অনুপ্রাণিত করবে।
কার্যকরী কমিটির বৈঠকে শুধু জাতীয় দলের বিষয় নয়, ২০২৬-২৭ মরশুমের ইন্ডিয়ান সুপার লিগ (আইএসএল) নিয়েও বিস্তর আলোচনা হয়।
বিশেষ করে ক্লাবগুলোর নেতৃত্বে নতুন বাণিজ্যিক কাঠামোয় লিগ পরিচালনার পরিকল্পনা কতটা এগিয়েছে, তা পর্যালোচনা করা হয়েছে। ভবিষ্যতে আইএসএলকে আরও আর্থিকভাবে শক্তিশালী এবং প্রতিযোগিতামূলক করে তোলার লক্ষ্যে একাধিক প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
এছাড়া জামশেদপুর এফসিকে তাদের অবস্থান পুনর্বিবেচনার জন্য ১২ আগস্ট পর্যন্ত অতিরিক্ত সময় দেওয়ার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।
ভারতীয় ফুটবলের ভবিষ্যৎ গড়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে অনূর্ধ্ব-১৫ বিশ্বকাপের জন্য কোচ নির্বাচন করেছে এআইএফএফ।
কার্যকরী কমিটি সর্বসম্মতিক্রমে বিবিয়ানো ফার্নান্ডেজকে ভারতের অনূর্ধ্ব-১৫ পুরুষ দলের প্রধান কোচ হিসেবে অনুমোদন দিয়েছে।
বিবিয়ানো দীর্ঘদিন ধরেই ভারতীয় জুনিয়র ফুটবলে সফলভাবে কাজ করছেন। তরুণ ফুটবলারদের গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর অভিজ্ঞতা এবং সাফল্যের কথা মাথায় রেখেই তাঁকে এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
টেকনিক্যাল কমিটির অধিকাংশ সদস্যও তাঁর নামের পক্ষে মত দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
এবারই প্রথমবারের মতো ফিফা অনূর্ধ্ব-১৫ বিশ্বকাপ আয়োজন করছে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
এই প্রতিযোগিতার মূল উদ্দেশ্য শুধু চ্যাম্পিয়ন নির্ধারণ নয়। বরং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কিশোর ফুটবলারদের একত্রিত করে ফুটবলকে উৎসবের রূপ দেওয়াই ফিফার লক্ষ্য।
এই কারণেই ফিফার সদস্যভুক্ত প্রতিটি দেশকে এই বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। কোনও যোগ্যতানির্ণায়ক পর্ব ছাড়াই ভারতও সরাসরি এই প্রতিযোগিতায় খেলবে।
আগামী অক্টোবরে আজারবাইজানে অনুষ্ঠিত হবে এই বিশ্বকাপ।
সবচেয়ে আলোচিত সিদ্ধান্তগুলির মধ্যে অন্যতম হল রঞ্জিত বাজাজকে অনূর্ধ্ব-১৫ দলের ম্যানেজার হিসেবে নিয়োগ।
ভারতীয় ফুটবলে এই ধরনের সিদ্ধান্ত কার্যত নজিরবিহীন। কারণ, এর আগে কোনও ক্লাব কর্ণধারকে জাতীয় দলের ম্যানেজারের দায়িত্ব দেওয়া হয়নি।
মিনার্ভা একাডেমির মাধ্যমে রঞ্জিত বাজাজ ইতিমধ্যেই ভারতীয় জুনিয়র ফুটবলে বড় ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর তত্ত্বাবধানে ভারতীয় দল ও ক্লাব আন্তর্জাতিক জুনিয়র টুর্নামেন্টে একাধিক সাফল্য অর্জন করেছে।
গোথিয়া কাপ, হেলসিঙ্কি কাপ এবং ডানা কাপের মতো আন্তর্জাতিক জুনিয়র প্রতিযোগিতায় ভারতীয় দলকে সাফল্যের পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য রঞ্জিত বাজাজ বিশেষভাবে পরিচিত।
ম্যাচের আগে ড্রেসিংরুমে জাতীয় পতাকা হাতে ফুটবলারদের উদ্বুদ্ধ করার তাঁর বক্তৃতা বহুবার সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।
তিনি একাধিকবার দাবি করেছিলেন, সুযোগ পেলে অনূর্ধ্ব-১৫ বিশ্বকাপে ভারতীয় দলকে চ্যাম্পিয়ন করার লক্ষ্য নিয়েই কাজ করবেন। তাঁর সেই আত্মবিশ্বাস এবং অতীতের সাফল্যই এবার জাতীয় দলে বড় দায়িত্ব এনে দিল।
এআইএফএফের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তগুলো স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে ভারতীয় ফুটবল এখন শুধু বর্তমান নয়, ভবিষ্যতের দিকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছে। একদিকে ব্রাজিলের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ম্যাচের আয়োজন, অন্যদিকে এশিয়াডে অংশগ্রহণ এবং জুনিয়র ফুটবলের উন্নয়নে অভিজ্ঞ কোচ ও নতুন ধরনের ম্যানেজমেন্ট—সব মিলিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ইঙ্গিত মিলছে।
যদি এই পরিকল্পনাগুলি সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে ভারতীয় ফুটবল আগামী কয়েক বছরে আন্তর্জাতিক মঞ্চে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারে।


