খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img

বিদ্যুত চুক্তি বাতিল হচ্ছেনা,দাম কমাতে চলছে আলোচনা: জ্বালানিমন্ত্রী

বিগত সরকারের সময় বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি এখনই বাতিল করার সুযোগ নেই বলে জানিয়েছে সরকার। কারণ এসব চুক্তির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে...
Homeঅর্থ-বানিজ্যঋণ বিতরণ কমলেও বিদেশি ব্যাংকের মুনাফা বেড়েছে

ঋণ বিতরণ কমলেও বিদেশি ব্যাংকের মুনাফা বেড়েছে

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিভাগের বিশেষ সমীক্ষা ও প্রকল্প বিভাগ প্রকাশিত ‘বাংলাদেশে বিদেশি ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম: প্রবণতা এবং পরিচালনাগত পর্যবেক্ষণ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে

বাংলাদেশে কার্যরত বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো গত এক বছরে ঋণ বিতরণে উল্লেখযোগ্য সংযম দেখিয়েছে। মোট ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ কমে গেলেও তাদের মুনাফা বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈদেশিক বাণিজ্য, এলসি নিষ্পত্তি, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন এবং বিভিন্ন ব্যাংকিং সেবার কমিশন ও চার্জ থেকে উচ্চ আয়ই এই মুনাফা বৃদ্ধির প্রধান কারণ। ফলে স্থানীয় ঋণ কার্যক্রমে গতি না থাকলেও বিদেশি ব্যাংকগুলো তাদের আর্থিক অবস্থান শক্তিশালী রাখতে সক্ষম হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিভাগের বিশেষ সমীক্ষা ও প্রকল্প বিভাগ প্রকাশিত ‘বাংলাদেশে বিদেশি ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম: প্রবণতা এবং পরিচালনাগত পর্যবেক্ষণ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বিদেশি ব্যাংকগুলোর আর্থিক কার্যক্রম, আমানত, ঋণ, সম্পদ, বৈদেশিক বাণিজ্যে অংশগ্রহণ এবং মুনাফার সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মোট ঋণ ও অগ্রিম ছিল ৫১ হাজার ৯৭০ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এই পরিমাণ কমে দাঁড়ায় ৪৬ হাজার ১২২ কোটি টাকায়। অর্থাৎ বছরে ঋণ বিতরণ প্রায় ১১ দশমিক ৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

অন্যদিকে ঋণ কমলেও কর-পরবর্তী নিট মুনাফা বেড়ে হয়েছে ৩ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা। একই সময়ে পুনর্বিনিয়োগকৃত আয়ের পরিমাণ কমে ৪ হাজার ৫৯৪ কোটি টাকা থেকে ২ হাজার ৯৬ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। বিপরীতে বিদেশে পাঠানো মুনাফার পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩১৪ কোটি টাকায়। শুধু ২০২৫ সালের দ্বিতীয়ার্ধেই বিদেশি মূল কোম্পানিগুলোর কাছে ৫৬২ কোটি টাকা লভ্যাংশ পাঠানো হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ঋণ বিতরণ কমে যাওয়ার পরও বৈদেশিক লেনদেন থেকে অর্জিত কমিশন ও সার্ভিস চার্জ বিদেশি ব্যাংকগুলোর আয় ধরে রাখতে এবং মুনাফা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

বর্তমানে বাংলাদেশে নয়টি বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব ব্যাংকের রয়েছে ৭০টি শাখা এবং পাঁচটি উপ-শাখা।

স্বাধীনতার পর থেকেই বিদেশি ব্যাংকগুলো মূলত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অর্থায়ন, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন, বহুজাতিক কোম্পানিকে ব্যাংকিং সুবিধা প্রদান এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারের সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে।

যদিও শাখা সংখ্যা, ঋণ বিতরণ এবং আমানতের পরিমাণে দেশীয় ব্যাংকগুলোর তুলনায় তাদের উপস্থিতি সীমিত, তবুও প্রযুক্তি, সেবার মান, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং দক্ষতার কারণে তাদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৭ হাজার ৫৬৭ কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ৮৭ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট আমানতে খুব সামান্য বৃদ্ধি ঘটেছে।

তবে দেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে বিদেশি ব্যাংকগুলোর অংশীদারিত্ব কমেছে। ২০২৪ সালে মোট আমানতের ৪ দশমিক ৬ শতাংশ বিদেশি ব্যাংকের হাতে থাকলেও ২০২৫ সালের শেষে তা কমে ৪ দশমিক ২ শতাংশে নেমে এসেছে।

আমানতের ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাবের আমানত সবচেয়ে বেশি, যা মোট আমানতের ৩৯ শতাংশ। আবাসিক বৈদেশিক মুদ্রা আমানতের অংশ ১৭ শতাংশ। এসব ব্যাংকে স্থায়ী আমানতরে পরিমান ১৬ শতাংশ,এখানে স্পেশাল নোটিশ ডিপোজিট ৫ শতাংশ এবং অন্যান্য আমানতের পরিমান রয়েছে ২৩ শতাংশ।

বিদেশি ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের বড় অংশ এখনও শিল্প খাতে কেন্দ্রীভূত। মোট ঋণের ৫২ শতাংশ শিল্প খাতে গেছে। ব্যবসা ও বাণিজ্য খাতে গেছে ২০ শতাংশ। এছাড়া ভোক্তা ঋণের অংশ ১৬ শতাংশ, অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ ৮ শতাংশ এবং অন্যান্য খাতে ৪ শতাংশ।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, শিল্প খাতে ঋণ ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের ২২ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ২৪ হাজার ২৬৪ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

অন্যদিকে ব্যবসা ও বাণিজ্য খাতে ঋণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এক বছরে এ খাতে ঋণ ১৫ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা থেকে নেমে এসেছে ৯ হাজার ১১০ কোটি টাকায়।

বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, স্থানীয় বাজারের ঝুঁকি এবং করপোরেট ঋণের ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থানের কারণে বিদেশি ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ অনুমোদনে সংযত নীতি অনুসরণ করেছে।

সামগ্রিক ঋণ কমলেও কৃষি, মৎস্য ও বনায়ন খাতে বিদেশি ব্যাংকগুলোর অর্থায়ন বেড়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে এই খাতে ঋণের পরিমাণ ছিল ৭২৬ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকায়।

মোট ঋণের তুলনায় এই অংশ এখনও ছোট হলেও উৎপাদনমুখী ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতে বিদেশি ব্যাংকগুলোর আগ্রহ বৃদ্ধির একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে বিষয়টিকে দেখা হচ্ছে।

বিদেশি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হারও কিছুটা বেড়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে যেখানে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৪ দশমিক ৯ শতাংশ, ২০২৫ সালের জুনে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬ দশমিক ১ শতাংশে। বছরের শেষে এই হার কিছুটা কমে ৫ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে আসে।

যদিও খেলাপি ঋণের হার বৃদ্ধি পেয়েছে, তারপরও অধিকাংশ দেশীয় ব্যাংকের তুলনায় বিদেশি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের অবস্থান এখনও অনেক ভালো বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে বিদেশি ব্যাংকগুলোর অংশগ্রহণ এখনও উল্লেখযোগ্য।

২০২৫ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে ৪ দশমিক ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রপ্তানি আয় দেশে এসেছে। এটি জাতীয় মোট রপ্তানি আয়ের ১৮ দশমিক ৮ শতাংশ।

বিদেশি ব্যাংক গুলি রেডিমেট পোশাক, চামড়া এবং রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) ভিত্তিক শিল্পের আন্তর্জাতিক লেনদেনে এসব ব্যাংকগুলোর ভূমিকা সবচেয়ে বেশি।

একই সময়ে এসব ব্যাংকের মাধ্যমে ৪ দশমিক ২৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের আমদানি মূল্য পরিশোধ করা হয়েছে, যা দেশের মোট আমদানির ১৩ দশমিক ১ শতাংশ।

আমদানিকৃত পণ্যের মধ্যে প্রধান ছিল টেক্সটাইল কাঁচামাল, রাসায়নিক দ্রব্য, শিল্প যন্ত্রপাতি এবং উৎপাদন কার্যক্রমে ব্যবহৃত বিভিন্ন উপকরণ।

বিদেশি ব্যাংকগুলোর একটি দুর্বল দিক হলো প্রবাসী আয় সংগ্রহ।

২০২৫ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে এসব ব্যাংকের মাধ্যমে মাত্র ৪৭ দশমিক ৪২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স দেশে এসেছে। যা দেশের মোট রেমিট্যান্স প্রবাহের মাত্র ০ দশমিক ৩ শতাংশ।

বিশ্লেষকদের মতে, দেশে সরকারি ও দেশীয় বেসরকারি ব্যাংকগুলোর বিস্তৃত নেটওয়ার্ক এবং মোবাইল আর্থিক সেবার জনপ্রিয়তার কারণে রেমিট্যান্স বাজারে বিদেশি ব্যাংকগুলোর অংশগ্রহণ সীমিত রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এসব ব্যাংকগুলোর মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ২১৯ কোটি টাকা।

মোট সম্পদের মধ্যে বেসরকারি খাতের ওপর দাবি ২২ শতাংশ এবং সরকারি খাতের ওপর দাবি ১৩ শতাংশ।

বিদেশি সম্পদের পরিমাণ বেড়ে হয়েছে ১৭ হাজার ৯৪৮ কোটি টাকা, যা মোট সম্পদের ৬ দশমিক ২ শতাংশ।

অন্যদিকে মোট দায়ের মধ্যে আমানতের অংশ ২৮ দশমিক ৪ শতাংশ। বিদেশি দায় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৭৬০ কোটি টাকায়। এছাড়া মূলধন ও সঞ্চিতির পরিমাণ ১৫ হাজার ৬১৭ কোটি টাকা, যা মোট দায়ের ৫ দশমিক ৪ শতাংশ।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিদেশি ব্যাংকগুলোর ব্যালেন্স শিটের সম্পদের ৫৬ শতাংশের বেশি এবং দায়ের ৬২ শতাংশের বেশি “অন্যান্য” শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত। এর মধ্যে অফ-ব্যালেন্স শিট আইটেম এবং সম্ভাব্য সম্পদ ও দায়ের বিপরীত এন্ট্রিগুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই প্রবণতা ইঙ্গিত করে যে বিদেশি ব্যাংকগুলো স্থানীয় বাজারে ঋণ সম্প্রসারণের পরিবর্তে তুলনামূলক বেশি তারল্য ধরে রাখার কৌশল অনুসরণ করছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আর্কাইভ