খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeবিশ্ব সংবাদওয়েস্ট বেঙ্গলসীমান্ত অনুপ্রবেশ ব্যবসা ফাঁস: ঘাটপিছু ৬ লাখ, বছরে ৯০০ কোটির কারবার

সীমান্ত অনুপ্রবেশ ব্যবসা ফাঁস: ঘাটপিছু ৬ লাখ, বছরে ৯০০ কোটির কারবার

সীমান্তের এপারে কিছু লোক থাকত, যাদের বলা হত ‘লাইনম্যান’। তাঁদের কাজ ছিল নজর রাখা— কোথায় বিএসএফ টহল দিচ্ছে, কোথায় ফাঁকা আছে। সব ঠিক থাকলে ফোনে সংকেত পাঠানো হত ওপারে। তারপরই দ্রুত পারাপার হয়ে যেত।

উত্তর ২৪ পরগনার স্বরূপনগর। একদিকে নদী, অন্যদিকে সবুজ মাঠ, মাঝখানে ছড়িয়ে থাকা সীমান্ত এলাকা। বাইরে থেকে দেখলে একেবারে সাধারণ গ্রামাঞ্চল। কিন্তু এই শান্ত পরিবেশের আড়ালেই বহু বছর ধরে চলেছে এক বিশাল অবৈধ ব্যবসা— যাকে স্থানীয়রা বলত ‘ধুড় পারাপার’।

এই ব্যবসার সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন সিরাজুল (নাম পরিবর্তিত)। তাঁর বাড়ি থেকে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের দূরত্ব খুব বেশি হলে চার কিলোমিটার। এত কাছেই সীমান্ত হওয়ায় ছোটবেলা থেকেই তিনি দেখেছেন লোকজনের যাতায়াত, নানা ধরনের গোপন লেনদেন, আর ধীরে ধীরে সেই জগতের মধ্যেই ঢুকে পড়েন তিনি।

প্রায় বিশ বছর ধরে চলা এই ব্যবসা হঠাৎ করেই থেমে গেছে। গত কয়েক মাসে প্রশাসনিক কড়াকড়ি বেড়েছে, নজরদারি কঠোর হয়েছে, ফলে আগের মতো আর পারাপার সম্ভব হচ্ছে না। সিরাজুল বলছেন, এখন আর এই কাজে ফেরার কোনও সুযোগ নেই বলেই মনে হচ্ছে। তাই বাধ্য হয়ে অন্য কাজের খোঁজে বেরোতে হয়েছে তাঁকে।

স্বরূপনগর থেকে টাকি, ঘোজাডাঙা, হাকিমপুর, আমুদিয়া— এই পুরো সীমান্ত এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে ছিল অসংখ্য ‘ঘাট’। এখানে ‘ঘাট’ বলতে নদীর ঘাটই শুধু নয়, বরং এমন সব জায়গা বোঝানো হত, যেখানে নজরদারি তুলনামূলক কম এবং দ্রুত সীমান্ত পার হওয়া যায়।

কোথাও ধানক্ষেতের আড়াল, কোথাও পাটখেত, আবার কোথাও সরু কাঁচা রাস্তা— এই সব জায়গাই হয়ে উঠেছিল পারাপারের রুট। কোনও কোনও জায়গা এতটাই নির্জন ছিল যে, দিনের বেলাতেও নজর এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হত।

সিরাজুলের কথায়, “সব ঘাট এক রকম ছিল না। কিছু ঘাট খুব ‘সেফ’ ধরা হত। আবার কিছু জায়গা ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। কোন দিন কোন ঘাট দিয়ে পারাপার হবে, সেটা পরিস্থিতি বুঝে ঠিক করা হত।”

আরও পড়ুন :  মিশরকে হারিয়েও কেন কেঁদেছিলেন মেসি? পেনাল্টি মিসের পর বিস্ফোরক স্বীকারোক্তি!

এই পুরো প্রক্রিয়াটা ছিল অনেকটা একটা চেইনের মতো। একাধিক স্তরে ভাগ করা ছিল কাজ।

প্রথম ধাপ শুরু হত বাংলাদেশে। সেখানকার ‘ঘাটপার্টি’ ঠিক করত কখন এবং কোথা দিয়ে লোকজনকে সীমান্তের দিকে আনা হবে। অনেক ক্ষেত্রে তারা সীমান্তে নজরদারির খবরও রাখত।

এরপর সীমান্তের এপারে থাকত ‘লাইনম্যান’। এদের কাজ ছিল খুব গুরুত্বপূর্ণ। তারা নজর রাখত বিএসএফ-এর টহলদারির উপর— কোথায় জওয়ানরা যাচ্ছে, কোন এলাকায় ফাঁকা আছে, কোথায় কিছু সময়ের জন্য নজরদারি কম।

সব কিছু ঠিক থাকলে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ওপারে সংকেত পাঠানো হত। সেই সংকেত পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত পারাপার করিয়ে দেওয়া হত লোকজনকে।

এই পুরো কাজটাই হত অত্যন্ত দ্রুতগতিতে। কয়েক মিনিটের মধ্যে একদল মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে যেত।

অনেকেই ভাবেন এই ধরনের কাজ শুধু রাতের অন্ধকারেই হয়। কিন্তু বাস্তবটা আলাদা।

সিরাজুল জানাচ্ছেন, সুযোগ পেলে দিনের বেলাতেও পারাপার হত। বিশেষ করে যখন নজরদারি কম থাকত বা অন্য দিকে টহল বেশি থাকত, তখন দিনের আলোতেই কাজ সেরে নেওয়া হত।

এই পুরো ব্যবসার মূল আকর্ষণ ছিল টাকা।

বাংলাদেশ থেকে যারা ভারতে ঢুকতে চাইত, তারা প্রথমে সেখানকার দালাল বা ‘ঘাটপার্টি’-কে টাকা দিত। মাথাপিছু প্রায় ১৫ হাজার টাকা (বাংলাদেশি মুদ্রায়) নেওয়া হত বলে দাবি।

এরপর সেই যোগাযোগ পৌঁছে যেত ভারতের দালালদের কাছে। পুরো লেনদেনটাই হত ফোনের মাধ্যমে। অনেক সময় মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস ব্যবহার করে টাকা পাঠানো হত।

ভারতে ঢোকার পর শুরু হত এপারের দালালদের কাজ। সীমান্ত থেকে লোকজনকে নিরাপদ জায়গায় আনা, তারপর কাছাকাছি বাসস্ট্যান্ড বা রেলস্টেশনে পৌঁছে দেওয়া, এমনকি ট্রেনে তুলে দেওয়া— সবটাই তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ত।

আরও পড়ুন :  এক দশকের মধ্যে অর্থের প্রয়োজন কমে যাবে, ইলন মাস্কের ভবিষ্যদ্বাণী

সিরাজুলের দাবি অনুযায়ী, প্রতিটি লোকের জন্য ভারতীয় দালালরা প্রায় ৩ হাজার টাকা পেতেন।

একটি ঘাট দিয়ে দিনে গড়ে ৩০-৩৫ জন পারাপার করত। সেই হিসেবে মাসে প্রায় হাজারের কাছাকাছি মানুষ একটি ঘাট দিয়ে ঢুকত।

এভাবে হিসেব করলে, প্রতিটি ঘাট থেকেই মাসে প্রায় ৬ লাখ টাকার ব্যবসা হত।

শুধু একটি বা দুটি ঘাট নয়— গোটা পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত জুড়ে এমন প্রায় হাজারখানেক ঘাট সক্রিয় ছিল বলে দাবি। ফলে মোট লেনদেনের অঙ্ক ছিল বিশাল।

মাসে প্রায় ৭০-৮০ কোটি টাকা এবং বছরে ৮০০ থেকে ৯০০ কোটি টাকার ব্যবসা চলত বলে অনুমান।

এই ব্যবসায় লাভ যেমন ছিল, তেমনই ঝুঁকিও কম ছিল না।

কেউ যদি ধরা পড়ে যেত, তাহলে পুরো টাকা ডুবে যেত। শুধু তাই নয়, ওপারের দালালদের টাকা ফেরত দিতে হত। ফলে অনেক সময় বড়সড় লোকসান হত।

সিরাজুল বলছেন, “একবার ধরা পড়লে শুধু সেই দিনের নয়, আগের টাকাও চলে যেত। তখন সব নিজের পকেট থেকে সামলাতে হত।”

ভারতে ঢোকার পরও সমস্যার শেষ হত না। বরং নতুন চ্যালেঞ্জ শুরু হত।

এ দেশে থাকতে গেলে দরকার হয় পরিচয়পত্র— যেমন আধার কার্ড, ভোটার কার্ড, প্যান কার্ড। এই নথি ছাড়া কোথাও কাজ পাওয়া বা থাকা কঠিন।

এই জায়গাতেই গড়ে উঠেছিল আরেকটি চক্র।

অভিযোগ অনুযায়ী, কিছু অসাধু স্থানীয় নেতা এবং প্রশাসনিক কর্মীরা এই কাজে যুক্ত ছিলেন। টাকার বিনিময়ে ভুয়ো নথি তৈরি করে দেওয়া হত।

আরও পড়ুন :  ঢাকার বাতাস আজ ‘সহনীয়’, দূষণের তালিকায় ১৭তম

জন্ম সনদ, বাসিন্দার শংসাপত্র— সব কিছুই বানানো হত এমনভাবে, যাতে তা একেবারে আসল বলে মনে হয়।

এক প্রাক্তন পঞ্চায়েত প্রধানের নামও উঠে এসেছে। অভিযোগ, তিনি নাকি কাগজকে পুরনো দেখানোর জন্য বিশেষ কৌশল ব্যবহার করতেন—

কাগজ ভাঁজ করা, ঘষে দাগ তৈরি করা, এমনকি চালের বস্তার মধ্যে রেখে কিছুদিন রেখে দেওয়া— যাতে দেখে মনে হয় বহু বছরের পুরনো নথি।

এই কাজের জন্য কখনও ৫০০ টাকা, আবার কখনও ১০-১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হত।

গত কয়েক মাসে এই পুরো ব্যবস্থাটাই ভেঙে পড়েছে।

প্রশাসনিক নজরদারি বেড়েছে, সীমান্তে কড়াকড়ি বাড়ানো হয়েছে, ফলে আগের মতো সহজে পারাপার সম্ভব হচ্ছে না।

এর প্রভাব পড়েছে বহু মানুষের জীবনে। শুধু দালাল নয়, এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত অনেকেই এখন বেকার হয়ে পড়েছেন।

সিরাজুলের মতো অনেকেই এখন নতুন করে জীবন শুরু করার চেষ্টা করছেন।

তিনি বলছেন, “আগে যা করতাম, এখন সেটা আর সম্ভব নয়। তাই অন্য কিছু করতে হবে। কিন্তু এতদিন এই কাজ করার পর হঠাৎ করে নতুন কিছু শুরু করা সহজ নয়।”

এই পুরো ঘটনাটা শুধু একটি অবৈধ ব্যবসার গল্প নয়। এটা আসলে একটি অদৃশ্য অর্থনীতির পতনের গল্প।

যেখানে হাজার হাজার মানুষ কোনও না কোনওভাবে যুক্ত ছিল। কেউ সরাসরি, কেউ পরোক্ষে।

আজ সেই চক্র প্রায় ভেঙে গেছে। কিন্তু এর প্রভাব এখনও রয়ে গেছে সীমান্ত এলাকার সমাজ ও অর্থনীতিতে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আর্কাইভ